চাঁদফুল - এক অন্তহীন ভালবাসার গল্প
লেখক: মোঃ ফেরদাউছ জাহান
(২৪.০৬.২০২২)
ChandPhool - An Endless Love Story
Writer: Md Ferdaus Jahan
_____
• পরিচ্ছেদ: ১
কোনো এক গ্রামে চাঁদের মতো সুন্দর, ফুলের মতো ফুটফুটে এক মেয়ে বাস করত। সেই মেয়েকে সবাই আদর করে চাঁদফুল বলে ডাকত। সেই চাঁদফুল মেয়েটি ছিল খুবই নম্র ও ভদ্র, তাই তাকে সবাই ভালবাসত।
মেয়েটি এক মধ্যবিত্ত পরিবারে বাস করত। মেয়েটির ছিল এক ভাই এক বোন। চাঁদফুল ছিল ভাইবোনদের মধ্যে মধ্যম। তার বড়ভাই বিদেশে থাকত আর ছোটবোন ও সে বাড়িতে থেকে পড়াশোনা করত। ওরা দুজনেই উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ত।
পাশের গ্রামে একটি ছেলে ছিল নাম তার আকাশ। সেও একই বিদ্যালয়ে চাঁদফুলের সাথে পড়ত। চাঁদফুল সহপাঠী হিসেবে আকাশের সাথে প্রায়ই কথা বলত। কিন্তু আকাশ যে চাঁদফুলের আত্মীয় সে তা জানত না। অবশেষে একদিন তা জানতে পারল যে ওর বাবার সাথে আকাশের বাবার অনেকদিন ধরে বন্ধুত্ব রয়েছে।
একবার ওদের গ্রামে এক সংস্থা কয়েকটি বিষয়ে ট্রেনিং কোর্স নিয়ে আসে। সেই ট্রেনিং কোর্সে চাঁদফুল এবং ওদের আশেপাশের অনেক লোক এসে ভর্তি হয়। অবশেষে আকাশ এই ট্রেনিং এর কথা জানতে পেরে সেও এসে ভর্তি হয় এই ট্রেনিং কোর্সে।
ট্রেনিং ক্লাসে চাঁদফুলের সাথে ওর প্রায়ই দেখা হতো, ক্লাস নিয়ে অনেক কথাবার্তা হতো। কোনো বিষয় না বুঝলে ট্রেইনারের কাছ থেকে বুঝার পাশাপাশি একজন অন্যজনের কাছ থেকেও বুঝত। এইভাবে ধীরে ধীরে ওদের মধ্যে এক বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে উঠতে লাগল।
আকাশ মাঝে মাঝে চাঁদফুলের বাড়িতে বন্ধু হিসেবে বেড়াতে যেত এবং চাঁদফুলও আকাশের বাড়িতে যেত। যদি কোনো কারণে আকাশ বিদ্যালয়ে না যেত, ওই দিনে বিদ্যালয়ে কি কি পড়া হয়েছে এবং কি কি বাড়ির কাজ দেওয়া হয়েছে সেগুলো চাঁদফুলের কাছ থেকে সংগ্রহ করতো, চাঁদফুলও এরকম আকাশের কাছ থেকে বিদ্যালয়ের পড়া সংগ্রহ করতো।
একবার ওদের বিদ্যালয়ে কম্পিউটার বিষয়ে প্রতিযোগিতা আসে, এই প্রতিযোগিতা হবে পুরো জেলার মধ্যে। প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের জন্য ওদের বিদ্যালয়ের কয়েকজনকে বাছাই করা হয়, যারমধ্যে আকাশ ও চাঁদফুল রয়েছে। প্রতিযোগিতার প্রস্তুতির জন্য শিক্ষক মাঝে মাঝে ওদের বিদ্যালয়ের কম্পিউটার দিয়ে ক্লাস করাতেন। কিন্তু বাড়িতেও কম্পিউটার দিয়ে প্রস্তুতি নেওয়াটা জরুরী ছিল। চাঁদফুলের নিজস্ব কম্পিউটার ছিল যা দিয়ে সে গেইম খেলত, কিন্তু আকাশের কোনো কম্পিউটার ছিলনা। এ বিষয়টি জানতে পেরে চাঁদফুল তার মা-বাবাকে বলল, এবং ওর মা-বাবা বললেন যে আকাশ যেন ওদের বাড়িতে এসে প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের জন্য প্রস্তুতি নেয়। এতে চাঁদফুল অনেক খুশি হয়ে তার বন্ধু আকাশকে জানালো। আকাশ যদিও প্রথমে না করে অবশেষে চাঁদফুলের কথায় রাজি হলো। চাঁদফুল শুধু কম্পিউটার দিয়ে গেইম খেলত প্রতিযোগিতার জন্য যা শিখা প্রয়োজন তা ও পারত না, কিন্তু আকাশ এইসব কিছু পারত। কারণ আকাশ এর আগে কম্পিউটার ট্রেনিং সেন্টারে ভর্তি হয়ে কম্পিউটার বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করেছিল। তারপর থেকে আকাশ চাঁদফুলের বাড়িতে যেত, কম্পিউটার শিখত আর চাঁদফুল আকাশের কাছ থেকে ওইসব কিছু শিখত আর বুঝত।
আকাশ চাঁদফুলকে শুধু তার একজন ভালো বন্ধু হিসেবেই দেখত, কিন্তু চাঁদফুল মনে মনে আকাশকে ভালবাসতে শুরু করেছিল। আকাশ যখন কম্পিউটারে প্রস্তুতি নিত তখন চাঁদফুল তার পাশে বসে তা দেখত ও শিখত। যখন কোনো কিছু বুঝতনা তা আকাশকে জিজ্ঞেস করে বুঝত। আকাশ তো শুধু কম্পিউটারের দিকেই চেয়ে চেয়ে কাজ করত আর চাঁদফুল লুকিয়ে লুকিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকত। মাঝে মাঝে আকাশের চোখে চোখ পরলে লজ্জায় মুখ ঘুরিয়ে নিত।
যখন আকাশ চাঁদফুলের বাড়িতে থাকা অবস্থায় ঝড়-বৃষ্টি হতো তখন চাঁদফুলের মা-বাবা আর আকাশকে ওর বাড়িতে যেতে দিতেন না। ওনাদের বাড়িতেই রাখতেন। চাঁদফুল গান গাইতে খুব ভালবাসত আর আকাশ ছবি আঁকতে পছন্দ করত। চাঁদফুল যখন খুবই আবেগী হতো তখন গান গাইত। আকাশ অনেকদিন ওর গান শুনেছে। আকাশের কাছে চাঁদফুলের গাওয়া গান খুব ভালো লাগত। যখন আকাশ চাঁদফুলের বাড়িতে থাকা পরতো চাঁদফুল আকাশের সাথে অনেক গল্প করত।
কাজের মধ্যে বিদ্যুৎ চলে গেলে চাঁদফুল আকাশের কাছ থেকে ছবি আঁকা শিখতো। ছবি আঁকা শিখার মধ্যে চাঁদফুল ভুল করলে আকাশ দু-একবার বুঝিয়ে দিত, তারপরও যখন চাঁদফুল ভুল করত তখন চাঁদফুলের হাতে ধরে ছবি আঁকা শিখাতো। আকাশের হাত ধরাটা চাঁদফুলের কাছে খুবই ভালো লাগতো, তাই ইচ্ছে করেই একেকবার ভুল করত যাতে আকাশ ওর হাত ধরে শিখায়।
চাঁদফুল চাইত আকাশের সাথে বিদ্যালয়ে যাওয়া-আসা করতে কিন্তু সুযোগ পেত না। অবশেষে একদিন চাঁদফুলের আশাপূর্ণ হলো। চাঁদফুল আর আকাশ একসাথে বিদ্যালয়ে গেল। যাওয়ার পথে আকাশ কোনো কথা বলে না, যা কথা বলার চাঁদফুল একাই বলল, আকাশ মাঝে মাঝে দু-এক কথা ছাড়া আর কিছুই বলল না।
আকাশের সাথে থাকাটা, কথা বলাটা চাঁদফুলের কাছে যে কত আনন্দের বিষয় তা বলে বুঝানোর মতো নয়। চাঁদফুল যখন কোনো কিছু খেতো তখন আকাশকেও খাওয়াতো। আর যখন আকাশকে কাছে পেত না ওই খাবারগুলো জমা করে রাখত এবং পরে আকাশকে দিত।
একদিন আকাশ কিছুটা অসুস্থ ছিল। কম্পিউটারে কাজ করার মধ্যে ওর ভিষণ মাথা ব্যাথা শুরু করল যার জন্য আর কাজ করতে পারতেছিল না। তখন চাঁদফুল আকাশকে বলল বিছানায় শুয়ে বিশ্রাম নিতে, আকাশও তাই করল। কিন্তু ওর মাথা ব্যাথা কমতেছে না। এমতাবস্থায় চাঁদফুল আকাশের মাথা বুলিয়ে দিতে লাগল। আকাশ না করলে চাঁদফুল ধমক দিয়ে চুপচাপ ঘুমাবার কথা বলল। তারপর আকাশ ধীরে ধীরে ঘুমিয়ে পরলো। ঘুম থেকে উঠে আকাশ আর কম্পিউটারে কাজ না করে বাড়িতে চলে গেল।
রাত্রিবেলা যখন ঘুমাতে গেল তখন ওর সাথে চাঁদফুলের কথা-বার্তা, আচরণ, মায়া-মমতা নিয়ে ভাবতে লাগলো। ও ভাবতে লাগলো চাঁদফুল কি আমাকে ভালবাসে নাকি বন্ধু হিসেবেই এই রকম করতেছে। এইসব নিয়ে একটা চিন্তার মধ্যে পরে গেল।
যাইহোক অবশেষে ওদের প্রতিযোগিতার সময় চলে আসল। প্রতিযোগিতায় ওরা সবাই ভালোভাবে প্রস্তুতি নিয়ে অংশগ্রহণ করল। এখন ফলাফলের জন্য সবাই অপেক্ষায় আছে। কয়েকদিন পর ফলাফল চলে আসল। প্রতিযোগিতায় আকাশ পুরো জেলার মধ্যে এক নাম্বার হিসেবে ঘোষিত হল। এই খবর শুনে সবাই অনেক খুশি হলো, সবার থেকে বেশি খুশি হল চাঁদফুল।
আকাশ প্রতিযোগিতায় এক নাম্বার হওয়ায় আকাশের বাবা একটা অনুষ্ঠানের আয়োজন করলেন। অনুষ্ঠানে উনার আত্মীয়-স্বজনদের নিমন্ত্রণ করলেন। চাঁদফুল, চাঁদফুলের মা-বাবাও আসলেন। অনুষ্ঠানের শেষের দিকে আকাশ চাঁদফুলকে বলল ওর সাথে কিছু কথা আছে। চাঁদফুল জিজ্ঞেস করল কি কথা। আকাশ চারদিকে খেয়াল করে দেখল কেউ আছে কি না। যখন দেখল কেউ নেই সে চাঁদফুলকে নিয়ে তার চিন্তা দূর করার জন্য চাঁদফুলকে জিজ্ঞেস করলো, তুইকি কাওকে ভালবাসিস? চাঁদফুল বলল হঠাৎ কেন এই প্রশ্ন? আকাশ বলল আগে আমার কথার উত্তর চাই। চাঁদফুল বলল না। আকাশ বলল আমি জানি তুই একজনকে ভালবাসিস আর সেই লোকটা কে সেটাও আমি জানি। চাঁদফুল বলল তোমাকে কে বলেছে আমি কাওকে ভালবাসি? আকাশ বলল তোর বান্ধবীদের জিজ্ঞেস করেছিলাম তোর ব্যাপারে, ওরাই আমাকে বলেছে। চাঁদফুল বলল কোন বান্ধবী বলেছে? আকাশ বলল সেটা জেনে তোর লাভ কি! আগে সত্যটা বল তুই কি সত্যিই কাওকে ভালবাসিস? আবারও চাঁদফুল বলল না, আমি কাওকে ভালবাসি না। আসলে চাঁদফুল চাইছিলনা আকাশকে যে ও ভালবাসে তা এতো সহজে বলতে। তাই বারবার আকাশের প্রশ্নের উত্তরে না করতেছিল। আকাশ বলল তুই যে বলতেছিস তুই কাওকে ভালবাসিস না, তাহলে কি তর বান্ধবীরা আমাকে মিথ্যা বলেছিল, তাহলে তর বান্ধবীরা কি বেঈমান, মিথ্যাবাদী? তখন চাঁদফুল আর না বলে থাকতে পারল না। চাঁদফুল বলল আমার বান্ধবীরা বেঈমান, মিথ্যাবাদী নই। আকাশ বলল তাহলে ওরা যে বলল তুই একজনকে ভালবাসিস এটা কি সত্য? চাঁদফুল বলল হ্যাঁ, সত্যি। আকাশ বলল তো কে সে? চাঁদফুল বলল কে সে তা তো তুমি জান-ই। আকাশ বলল আমি তো জানি সেই ছেলেটা আমি, তাহলে কি তুই আমাকে ভালবাসিস? চাঁদফুল হ্যাঁ বলার আগেই চাঁদফুলের মা ওকে ডাক দিলেন উনারা এখনই বাড়িতে যাওয়ার জন্য রওয়ানা দিবেন। তারপর চাঁদফুল 'হ্যাঁ' না বলেই চলে গেল।
প্রতিযোগিতা তো শেষ তাই আকাশের আর চাঁদফুলের বাড়িতে তেমন যাওয়াই হয় না। তখন বিদ্যালয়েও সরকারি কয়েকদিনের ছুটি ছিল।
কয়েকদিন পর বিদ্যালয়ের ছুটি শেষ হলো এবং সবাই বিদ্যালয়ে গেল। আকাশের সাথে চাঁদফুলের দেখা হলো। চাঁদফুল আকাশকে আড়ালে নিয়ে গিয়ে বলল যে, আসলে আমি তোমাকে অনেক ভালবাসি আর এই কথাটা বলার চেষ্টাও করেছিলাম কিন্তু বলতে পারিনি। অবশেষে তুমিই বুঝে গেছ আমি তোমাকে ভালবাসি। তুমি তো আমার মনের কথা জেনে গেছো, এখন তোমার মনের কথা আমাকে জানাও। উত্তরে আকাশ বলল আমি তো তকে ভালবাসিনা রে চাঁদফুল। আমি অন্য একজনকে পছন্দ করি। আমি ওকে অনেক ভালবাসি যদিও এখনো আমার মনের কথা ওর কাছে প্রকাশ করতে পারিনি। আর তুই শুধু আমার ভালো একজন বন্ধু, এর বেশি কিছু নয়।
এইসব কথা শুনে চাঁদফুল অদ্ভুত আচরণ করতে শুরু করল। ও আকাশকে বলল আমি তোমাকে এতোটাই ভালবাসি যে তুমি যদি আমাকে ভাল না বাসো আমি মরে যাব। এই কথা শুনে আকাশ চাঁদফুলকে বোঝানোর চেষ্টা করল এইরকম পাগলামি না করতে। কিন্তু চাঁদফুল বুঝতেই রাজি হলো না। সে আকাশের ভালবাসা চায়ই চাই, না পেলে মরে যাবে।
এমতাবস্থায় আকাশ ভারী চিন্তার মধ্যে পরল যে এখন কি করবে। চাঁদফুল তো আমার কথা বুঝতেছে না, আমি যদি ওকে ভাল না বাসি সত্যিই যদি ও মরে যায়! আমি তো ওকে ভালবাসি না, এখন কি করব? আকাশ কিছুই ভেবে পায় না সে কি করবে। চাঁদফুলও বারবার বলতেছে আকাশে যদি ওকে ভাল না বাসে মরে যাবে। আকাশ তার মনকে স্থির করতে পারছিল না।
অবশেষে সিদ্ধান্ত নিল যে চাঁদফুলকে বাঁচাতে হলে আমাকে ওর সাথে প্রেম করতেই হবে। কিন্তু আকাশ মনথেকে চায় না চাঁদফুলকে ভালবাসতে, ও তো অন্য একজনকে পছন্দ করে।
একদিন সুযোগ করে চাঁদফুলের সাথে দেখা করল এবং বলল আমি তোকে ভালবাসতে পারি কিন্তু কিছু শর্ত আছে। চাঁদফুল বলল আমি রাজি আছি বলো কি শর্ত? আকাশ বলল তুই কোনো দিনও নিজে নিজে মরতে পারবিনা মানে আত্মহত্যা করতে পারবি না। তুই যদিও আমাকে তর ভবিষ্যতে না পাশ তখনও আত্মহত্যা করতে পারবি না। আর তর আমার সম্পর্কের কথা কাউকে বলিস না, কেউ জানলে সমস্যা হতে পারে। চাঁদফুল বলল ঠিক আছে। তবে আমারও একটা শর্ত আছে। তুমি কথা দাও আমাকে কখনো ছেড়ে চলে যাবে না? আকাশ তো এমনিতেই চাঁদফুলকে ভালবাসতে চাইছিল না, শুধু চাঁদফুলকে বাঁচানোর জন্যেই এই প্রেমের সম্পর্ক করতেছে। তবুও চাঁদফুলের কথার জবাবে বলল ঠিক আছে, আমি তোকে ছেড়ে চলে যাব না। তারপর থেকে শুরু হলো আকাশ ও চাঁদফুলের প্রেম-ভালোবাসা।
_______________
• পরিচ্ছেদ: ২
আকাশ ও চাঁদফুল যে বিদ্যালয়ে পড়তো তা ছিল আকাশের বাড়ি থেকে অনেকটা দূরে কিন্তু চাঁদফুলের বাড়ি থেকে এতো দূরে ছিল না। চাঁদফুলের বাড়ির উপর দিয়েই আকাশকে বিদ্যালয়ে যেতে হতো। ওদের প্রেম হওয়ার পর থেকে চাঁদফুল বিদ্যালয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে জানালার পাশে বসে রাস্তার দিকে চেয়ে থাকতো আকাশের জন্য। আকাশকে দেখামাত্র তাড়াহুড়ো করে ঘর থেকে বের হতো আকাশের সাথে বিদ্যালয়ে যাবে বলে। তারপর দুজনে একজন আরেকজনের সাথে কথা বলে বলে বিদ্যালয়ে পৌঁছিত।
শ্রেণিকক্ষে দুজন সোজাসুজি বেঞ্চে বসতো। সুযোগ পেলে চাঁদফুল আকাশকে দেখত। যখন আকাশের চোখে চোখ পড়তো তখন জিহবা বের করে, চোখ বড় বড় করে দুষ্টুমি করতো। চাঁদফুলের এসব দুষ্টুমিতে আকাশ খুবই হাসতো। একদিন আকাশ শ্রেণিকক্ষে ছিল না, চাঁদফুল আকাশের ব্যাগ থেকে বই এনে লুকিয়ে রেখেছিল। আকাশ ব্যাগে বই না পেয়ে যখন অন্যজনের বই, ব্যাগ চ্যাক করতে লাগলো চাঁদফুল আকাশকে জিজ্ঞেস করলো, "কি খুজতেছো, আমি কি সাহায্য করবো?" আকাশ বলল, "আমার বই পাইতেছি না, দেখতো খুজে পাস কি না।" চাঁদফুল আকাশের পাশে থেকে থেকে বই খুজতে লাগলো আর মাঝে মাঝে কোমার দিয়ে ধাক্কা দিয়ে আকাশকে নিচে ফেলে দিয়ে হাসলো। আবার নিজের হাত দিয়ে আকাশকে উঠিয়ে ওর কাপর ঝেড়ে দিল। বিদ্যালয় ছুটির পরে রাস্তায় একসাথে যাওয়ার সময় চাঁদফুল আকাশকে বলল আমি তোমার বই পেয়েছি। এখন কথা হল আমি যদি বইটি দেই আমাকে তোমার বোনের হাতের তৈরি করা আমের আচার খাওয়াতে হবে। আকাশও বলল আচ্ছা খাওয়াবো। আগামীকাল বিদ্যালয়ে আসার সময় সাথে নিয়ে আসব। আকাশ তখন বুঝতে পেরেছিল চাঁদফুলই বই লুকিয়ে ছিল। যাইহোক, রাতের বেলা আকাশের পড়ার শেষে ওর বোনের কাছ থেকে কিছু আমের আচার নিয়ে দুইভাগ করলো। একভাগের সাথে প্রচুর মরিচ মিশালো।
পরেরদিন বিদ্যালয়ে যাওয়ার সময় চাঁদফুল আকাশকে বলল আমার আচার কোথায়? আকাশ বলল এনেছি, আমার ব্যাগে আছে। চাঁদফুল বলল আমার হাতে দাও, আমি খেয়ে খেয়ে যাব। আকাশ চাঁদফুলকে মরিচ মেশানো আচার দিল। চাঁদফুল আচার খাওয়ার পর ঝালে নাচানাচি করতে লাগলো। আকাশ পানির বোতল দিল, পানি খেয়ে চাঁদফুলের ঝাল নিবারন করলো। তারপর আকাশ চাঁদফুলকে জিজ্ঞেস করলো আচার কেমন লাগলো?
চাঁদফুল জবাবে বলল ফাটাফাটি-নাচানাচি স্বাদ। আকাশ ওর কথায় হাসলো। তারপর ব্যাগ থেকে মরিচ মিশানো ছাড়া আচার দিল আর বলল, নে এখন খা, এটাতে আমি মরিচ মিশাইনি। চাঁদফুল সেই আচার খেয়ে খেয়েই বিদ্যালয়ে গেল।
কয়েকদিন পর চাঁদফুল আকাশকে মজা বুঝাবার জন্য বাড়ি থেকে পানির বোতলে লবণ মিশিয়ে সে বোতল আকাশের ব্যাগে রেখে দিল আর আকাশের যে পানির বোতল ছিল তা সরিয়ে ফেললো। আকাশ বিদ্যালয়ের মাঠে খেলাধুলা করে ক্লান্ত হয়ে শ্রেণিকক্ষে গেল। পানির তৃষ্ণায় পানি পান করার জন্য ব্যাগ থেকে পানির বোতল বের করে পানি পান করার পর সাথে সাথে পানি মুখ থেকে ফেলে দিল, আর বলল এতো নোনতা! আর ওইদিকে চাঁদফুল এসব দেখে হাসতে থাকে আর আকাশকে উদ্দেশ্য করে বলে এখন কি রকম লাগলো! আমাকে ঐ দিন ঝাল খাইয়েছিলে তাই আজকে তোমাকে লবণ খাওয়ালাম, আমার সাথে চালাকি! আকাশ চাঁদফুলের কথায় হেসে দিল আর চাঁদফুলও হাসলো।
শ্রেণিকক্ষে মাঝে মাঝে আকাশকে শিক্ষক কিছু জিজ্ঞেস করলে উত্তর দিতে যখন পারতো না তখন চাঁদফুল ইশারার মাধ্যমে বা খাতায় লিখে আকাশকে উত্তর জানাতো এবং চাঁদফুলের বেলায়ও আকাশ এরকম করতো। টিফিনের সময় ক্যানটিনে দুজন পাশাপাশি বসতো। আকাশের যখন ইচ্ছে হতো চাঁদফুলের খাবার খেতো এবং চাঁদফুলের যখন ইচ্ছে হতো আকাশের খাবার খেতো। চাঁদফুল খেয়াল করে যখন দেখতো সবাই খাবার খাওয়ার খেয়ালে আছে তখন আকাশকে আদর করে নিজ হাতে খাইয়ে দিত। আর মাঝে মাঝে দুষ্টুমি করে আকাশের সমস্ত মুখ খাবার দিয়ে ভরিয়ে দিত। এইভাবে আকাশ ও চাঁদফুলের কেটে যায় অনেক দিন। যদিও এইদিনগুলো চাঁদফুল খুব খুশিতে, আনন্দে ভালো কাটিয়ে ছিল, কিন্তু আকাশের দিনগুলো কেটেছিল দুশ্চিন্তায়, অশান্তিতে।
চাঁদফুলের সাথে এতোদিন কাটানোর পরেও আকাশ চাঁদফুলকে মন থেকে ভালবাসতে পারছিল না। নিজের মনকে নিজে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছিল না। ভীষণ অশান্তির মধ্যে ছিল। কি করবে বুঝতে পারছিল না। ওর কাছে মনে হতে লাগলো চাঁদফুলকে প্রেমের কথা বলে ভুল করেছে। ওর সাথে মিথ্যা ভালবাসার অভিনয় করতেছে। চাঁদফুলকে নিয়ে সুখে থাকতে পারবেনা, চাঁদফুলের সাথে প্রতারণা করতেছে আরো অনেক কিছু। এখন কি করবে! চাঁদফুলকেও মুখ খুলে বলতে পারতেছে না যে ওকে মন থেকে ভালোবাসে না, ওর সাথে আর এইভাবে কতদিন প্রেম করবে যখন নিজের মনই চাঁদফুলকে চায় না। চাঁদফুলকে সত্যিকারের ভালবাসা বাসতে পারতেছে না। কিন্তু চাঁদফুলকে এই কথাগুলো না বললে বিষয়টা যদি আরো বড় হয়ে দাঁড়ায়! আর চাঁদফুলকে বললে ও যদি আবার পাগলামি শুরু করে! এইসব কথা চিন্তা করে আকাশের মানসিক চাপ বাড়তে থাকে।
একদিন চাঁদফুল নিজ হাতে কিছু নাস্তা রান্না করে আকাশকে ওদের বাড়িতে বেড়াতে আসার কথা বলল। আকাশও গেল। সেখানে চাঁদফুলের মা-বাবা ও পরিবারের লোকজনের সাথে অনেক গল্প করলো, টিভি দেখলো। তারপরে যখন চাঁদফুলকে একা পেল তখন আকাশ চাঁদফুলকে সাহস করে শুধু এই কথাটাই বলল যে "আমি তকে কেন জানিনা মন থেকে ভালবাসতে পারতেছিনা। এখন কি করব আমি?" চাঁদফুল বলল এইসব নিয়ে চিন্তা করো না, আমার ভালবাসায় সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। আকাশ বলল তোর ভালবাসা কি পারবে তোর প্রতি আমার সত্যিকারের ভালবাসা জন্মাতে, যাতে করে তকে আমি মন থেকে ভালবাসতে পারি, আমি কিন্তু পারতেছিনা। চাঁদফুল বলল হ্যাঁ পারবে। এইসব কথা বাদ দাও তো। আমি তো আছিই। এখন বলো কি খাবে?
আমি তোমার জন্য স্পেশাল করে কিছু নাস্তা রান্না করেছি। আকাশ বলল কি কি? চাঁদফুল বলল নাম বলা যাবেনা, শুধু এইটুকুই বলতে পারি সবগুলোই তোমার পছন্দের খাবার। তখন আকাশ বলল তাহলে নুডলস-ই হবে। চাঁদফুল বলল হ্যাঁ বলে নুডলস নিয়ে আসল, ওরা দুজনে খেল এবং ঘরের সবাইকে খেতে দিল। একেক করে সব খাবার খাওয়া শেষ হলো। চাঁদফুল তো আমের আচার খেতে খুব ভালবাসতো। তাই চাঁদফুলের জন্য আকাশ আমের আচার আলাদা করে নিয়ে আসছিল। চাঁদফুলের বাড়ি থেকে প্রস্থান করার আগ মুহূর্তে চাঁদফুলের হাতে আমের আচার দিয়ে বলল এটা তোর জন্য, নিঃসন্দেহে খেতে পার। তারপরে সে চলে গেল। চাঁদফুল দরজার পাশে দাড়িয়ে থেকে আকাশের দিকে চেয়ে রইলো।
_______________
• পরিচ্ছেদ ৩ :
তারপর আবার বিদ্যালয়ে একসাথে যাওয়া-আসা করা, দুষ্টুমি করা, কথা বলা ইত্যাদি চলতে থাকে অনেক দিন।
আকাশের ছোট চাচা ও তিনির পরিবার সহ শহরে থাকেন। একবার উনারা গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে আসেন। আকাশের ছোট চাচার এক মেয়ে ছিল, নাম তার লাবিবা। অনেক আগ থেকেই আকাশ ও লাবিবার মধ্যে খুবই ভালো বন্ধু ছিল।
লাবিবা যখন গ্রামের বাড়িতে আসতো আকাশের সাথেই খেলাধুলা করতো এবং আকাশের সাথেই গ্রামে ঘুরে বেড়াতো।
এইবারও লাবিবা ওর পরিবারের সাথে গ্রামে এসেছে। গ্রামে এসে আকাশের সাথে ওর বন্ধু-বান্ধবী, বিদ্যালয়, শহর ইত্যাদি নিয়ে অনেক গল্প করলো। কয়েকদিন পর ওরা দুজন চাঁদফুলের বাড়িতে গেল। চাঁদফুলের সাথেও অনেক গল্প করলো। চাঁদফুলকে সাথে নিয়ে গ্রাম ঘুরে দেখলো। আকাশ খেয়াল করে দেখলো চাঁদফুল আগের মতো ওর সাথে কথা বলে না, আগের মতো আচরণ করে না, ওকে দেখলে রাগী রাগী মনে হয়, এখন আর আকাশের বাড়িতে যায় না ইত্যাদি। যাইহোক এক সপ্তাহ গ্রামে থাকার পর লাবিবা ও তার পরিবার আবার শহরে চলে গেল।
লাবিবা ও তার পরিবার শহরে যাওয়ার পর চাঁদফুল আকাশের বাড়িতে আসলো। আকাশের সাথে কথা বলতে চাইলো, কিন্তু আকাশ কথা বলল না। চাঁদফুল আকাশকে বলল তুমি আমার সাথে কথা বলতেছ না কেন? আকাশ বলল এখন কেন আর কথা বলব, এতো দিন কোথায় ছিলে! চাঁদফুল বলল কি হয়েছে?
আকাশ বলল লাবিবা যতদিন বাড়িতে ছিল ততদিন তুই আমাদের বাড়িতে আসিসনি কেন, আমার সাথে ঠিক মতো কথা বলিসনি কেন? চাঁদফুল বলল ভুল হয়ে গেছে। তুমি যে লাবিবা আপুর সাথে ছিলে এজন্য আমি তোমাদের বাড়িতে আসিনি আর তোমার সাথে ঠিক মতো কথাও বলিনি। আসলে আমার একটু সন্দেহ হয়েছিল এবং এসব আমার মোটেও ভালো লাগেনি তাই। আকাশ বলল তাহলে তুই তর সন্দেহ নিয়ে থাক, আমার আর কি দরকার। যেখানে সন্দেহ থাকে সেখানে বিশ্বাস থাকে না, আর যেখানে বিশ্বাস নেই সেখানে ভালোবাসারও কোনো মূল্য নেই।
চাঁদফুল নিজের ভুল বুঝতে পারল। কিছুক্ষণ নিরব থাকলো। তারপর আকাশকে বলল আমার বড় ভুল হয়ে গেছে, এইবারের মতো ক্ষমা করে দাও আর এইরকম হবেনা। আকাশও বলল ঠিক আছে আর যেন এইরকম না হয়। তারপর চাঁদফুল বাড়িতে চলে গেল।
অন্যদিনের মতো আবারও ওরা দুজন বিদ্যালয়ে গেল। আজ শ্রেণিকক্ষ পরিষ্কার করা হবে। তাই ছেলে-মেয়েরা শ্রেণিকক্ষের বেঞ্চগুলো সরাচ্ছিলো। আকাশের সাথে ওর ক্লাসের এক মেয়ে ছিল। তখন চাঁদফুল ক্লাসে ছিল না। চাঁদফুল ক্লাসে এসে যখন দেখলো আকাশের সাথে অন্য এক মেয়ে বেঞ্চ সরাতে সাথে আছে তখন রেগে গেল। রেগে গিয়ে ওই মেয়েকে বলল, আপনি (দেৎ, তকে আপনি বলব কেন!) তুই কেনো ওর সাথে বেঞ্চ সরাতে আসছিস? ওই মেয়েটি বলল তখন আর কেও আকাশের সাথে ছিলনা তাই, আর তর সমস্যা কি রে তুই এইরকম কথা বলতেছিস? চাঁদফুল বলল সমস্যা আছে তবে সেটা তকে বলতে হবে কেন, তুই সর। ওই মেয়েটিও চাঁদফুলের কথায় রেগে গিয়ে বলল আমি সরবো না, তুই কে আমাকে সরবার? চাঁদফুল বলল তুই সরবি নইলে কিন্তু ভালো হবে না। এমতাবস্থায় আকাশ দুজনকেই দমক দিয়ে বলল তোমরা দুজনে কি শুরু করেছো, অযথা কেন ঝগড়া! ও যদি আমার সাথে বেঞ্চ সরাতে সাথে থাকে তাহলে তো কোনো সমস্যা না, আর তর যদি সমস্যা হয়েও থাকে তাহলে বুঝিয়ে বললেই তো হয় ঝগড়া করার কি দরকার! আর তুমি যদি কিছু মনে না কর তাহলে তোমার জায়গায় চাঁদফুলকে সুযোগ করে দিলে ভালো হতো, তাহলে আর ঝগড়াটা বাড়বে না। ওই মেয়েটি আকাশের কথা রাখলো আর চাঁদফুলও ওই মেয়ের কাছে ক্ষমা চাইলো। তারপর ওই মেয়েটি চলে গেল আর চাঁদফুল আকাশের সাথে থাকলো।
দুজনে মিলে বেঞ্চ সরাতে শুরু করলো। বেঞ্চ সরানোর মধ্যেও চাঁদফুলের দুষ্টুমি গেলনা। দুষ্টুমি করে আকাশের হাতে অজান্তেই ব্যথা দিল। আকাশের হাত বেঞ্চের আঘাতে ফুলে গেল। তারপর চাঁদফুল অফিস থেকে ব্যথা কমানোর মালিশ এনে আকাশের হাতে মালিশ করতে লাগলো। আকাশ চাঁদফুলকে বলল তুই কেন এতো দুষ্টুমি করিস, আমাকে তো ব্যথা দিস ঠিকই আবার সেবা-যত্নও করিস। তর যে কবে বুঝ হবে। চাঁদফুল বলল আমার বুঝের কি দরকার, তোমার বুঝ দিয়েই আমি চলতে পারবো। তোমার মানে আমার, আমি কি ঠিক বলিনি? আকাশ বলল হ্যাঁ, একদম ঠিক। বিদ্যালয় ছুটির পর দুজন বাড়িতে গেল। এরপরের দিন আবার বিদ্যালয়ে গেল। এইরকম করে গেল অনেক দিন।
হঠাৎ একদিন আকাশ বিদ্যালয় থেকে বাড়িতে আসার পর ওর এক চাচাতো বোন নাম নুরিন ওকে ডাক দেয়। ডাক দিয়ে বলে ভাই তোমার সাথে কিছু কথা আছে, তোমার কাছ থেকে একটা বিষয় সঠিকভাবে জানতে চাই সেটা সত্য কি না। আকাশ বলল ঠিক আছে নুরিন, আগে আমি ফ্রেশ হয়ে ভাত খেয়ে নিই তারপর না হয় তোর সাথে কথা বলল। নুরিন বলল আচ্ছা, আমাকে ফ্রী হয়ে ডাক দিও।
তারপর আকাশ ফ্রেশ হয়ে খাওয়া-দাওয়া করে নুরিন কে ডাক দেয়। নুরিন আসার পরে আকাশ জিজ্ঞেস করে, কি বলবি বল। নুরিন বলল বলবো আগে কথা দাও যা বলবা সত্য বলবা। আকাশ বলল ঠিক আছে। নুরিন জিজ্ঞাসা করলো তুমি কি চাঁদফুল আপুকে ভালোবাস? আকাশ বলল কেন, কি হয়েছে, হঠাৎ এই প্রশ্ন? নুরিন বলল আমি যা জিজ্ঞেস করেছি উত্তর দাও। আকাশ বলল তকে কেন বলব আমি কাওকে ভালবাসি কি না? নুরিন বলল কারণ...। আকাশ বলল কি কারণ? নুরিন বলল সেটা এখন তোমাকে বলব কেন, আগে উত্তর দাও। আকাশ বলল হ্যাঁ আমি চাঁদফুলকে ভালবাসি, আর তুই জানলে কি করে আমি যে চাঁদফুলকে ভালবাসি? নুরিন বলল আমি তোমাকে অনুসরণ করে জেনেছি, অনেকদিন ধরে চেষ্টা করেছিলাম তোমার কাছ থেকে এ বিষয়টা নিশ্চিত হব কিন্তু জিজ্ঞেস করা হয়নি। আর শুনো তুমি চাঁদফুল আপুকে ভালবাসতে পারবেনা। আকাশ বলল কেন? নুরিন বলল আমি তোমাকে ভালবাসতে দিবনা। আর এটা আমায় জিজ্ঞেস করো না যে কেন দিব না। আকাশ বলল আমি চাঁদফুলকে ভালবাসলে তোর সমস্যা কি? নুরিন বলল সমস্যা আছে। আর তুমি যদি চাঁদফুল আপুর সাথে প্রেম করা ছেড়ে না দাও আমি কিন্তু চাচা-চাচি এবং মেজো চাচাকে বলে দিব তোমার আর চাঁদফুল আপুর কথা। তখন আকাশ নুরিনকে বারণ করল এসব না করতে। নুরিন যদি মেজো চাচাকে সত্যি সত্যি বলে ফেলে তাহলে বড় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে, বড় ধরনের সমস্যা হবে। আকাশের মেজো চাচা খুবই রাগী এবং কঠিন লোক। ওনি প্রেম পছন্দ করেন না। ওনাকে বাড়ির সবাই মেনে চলেন। ওনার অবাধ্য হয়ে কেউই চলেনা, গ্রামের মধ্যে তিনি একজন খুব নামি-দামি বিচারক। গ্রামের সবাইও ওনাকে খুব সম্মান করে। আকাশ আর চাঁদফুলের কথা যদি ওনার কানে যায় তাহলে কি যে অবস্থা হবে বলার মতো নয়। এই নিয়ে আকাশ আরো মহা বিপদে পরে গেল। বড় চিন্তায় আছে নুরিনকে কিভাবে বুঝাবে!
_______________
• পরিচ্ছেদ ৪ :
১২/০৯/২০২৫
পরেরদিন আর কিছু না পেরে নুরিনকে চাঁদফুলের সমস্ত কথা বুঝিয়ে বলল কীভাবে কী হয়েছে। তখন নুরিন বলল, তুমি যখন ওকে মন থেকে ভালো না-ই বাস তাহলে এরকম করে কয়দিন চলবে। আকাশ বলল, দেখা যাক কি হয়, কিন্তু তুই প্লিজ সমস্যা বাড়াস না। নুরিন বলল, ঠিক আছে। তবে, একটা কথা বলে রাখি, মন থেকে ভালো না বেসে, ভালোবাসার অভিনয় করার চেয়ে অভিনয় না করাই ভালো বলে আমি মনে করি। আকাশ কোনো কথা না বলে চলে গেল।
বিকেলে চাঁদফুল আকাশের বাড়িতে আসলো। আকাশ বলল, তুই বলতো কীভাবে তকে মন থেকে ভালোবাসতে পারবো, আমি আর এরকম পারছিনা! চাঁদফুল তখন আকাশের পাশে গিয়ে বসলো। আকাশের মাথা নিজের কাধে রাখলো, আর মাথায় হাত বুলিয়ে কিছু সময় নিশ্চুপ হয়ে রইলো। পরে বলল, আমি জানি জোর করে ভালোবাসা হয় না। তোমায় বড্ড বেশি ভালোবাসি বলে এরকম কথা বলেছিলাম। তোমার যদি আমাকে নিয়ে কষ্ট হয়, অশান্তি হয়, বিরক্তি হয়, তাহলে আমি নিজেই তোমার জীবন থেকে সরে যাব। আমি চাইনা আমার জন্য তোমার কষ্ট হউক। কিন্তু জেনে রেখো, এই চাঁদফুল তোমায় প্রচন্ড ভালোবাসে। যখন তুমি মন থেকে আমায় চাইবে, আমাকে পাইবে। আমি তোমায় আগে ভালোবাসতাম, এখনো বাসি এবং ভবিষ্যতেও বাসবো। আজ থেকে তুমি আমার মুক্ত। আকাশের বলার মত কিছু রইলোনা, আর কি বা-ই বলবে! আকাশ নিস্তব্ধ হয়ে রইলো। কথা বলা শেষে চাঁদফুল উঠে দাড়ালো আর আকাশকে বলল, ভালো থেকো আর নিজের প্রতি খেয়াল রেখো। আকাশও দাড়িয়ে গিয়ে চাঁদফুলের হাতে ধরে বলল, তুই আমার ভুল বুঝিসনা, আমার জন্য আক্ষেপ নিসনা। চাঁদফুল কোনো রিপ্লাই না দিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে গেল, যাওয়ার সাথে সাথেই আবার ঘরে প্রবেশ করে আকাশকে জড়িয়ে ধরে কাদতে শুরু করলো। চাঁদফুলের চোখের পানিতে আকাশের শার্ট ভিজে গেল। আকাশ হতবুদ্ধি হয়ে গেল। চাঁদফুল জড়িয়ে ধরে বলল, আমি তোমায় ভালোবাসি, তুমি আমায় ভালোবাসো আর না-ই বাসো। এইকথা বলেই চাঁদফুল আকাশের বাড়ি থেকে চলে গেল।
_______________
• পরিচ্ছেদ ৫ :

